ডায়াবেটিস রোগীরা যেভাবে পায়ের যত্ন নেবেন

মানুষ করোনাভাইরাসের দাপটের মধ্যে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে আরো ভয়াবহ সমস্যা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী ২০৩০ সালে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩৬৬ মিলিয়নে। লাগামহীন ভাবে বেড়েই চলছে ডায়াবেটিসজনিত নানা জটিলতা আর দুর্ভোগ । পা নিয়ে ডায়াবেটিস রোগীদের বিভিন্নভাবে দুর্ভোগের শিকার হতে হয় । ডায়াবেটিস রোগীদের তুলনামূলক ভাবে পায়ে সংক্রমণ, পচন বা গ্যাংগ্রিন হওয়ার এবং পা কেটে ফেলার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে । ডায়াবেটিসের কারণে পায়ে যে জটিলতা দেখা দেয়, একে সামগ্রিকভাবে ডায়াবেটিক ফুট বলা হয়।

অগ্ন্যাশয়ের বিটা সেল থেকে নিঃসৃত ইনসুলিন হরমোন ঠিক মতো কাজ করতে না পারলে রক্তে চিনির মাত্রা বাড়তে থাকে। এদিকে বাড়তি শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ না করলেই বিপদ। একে একে বিকল হতে শুরু করে নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। বিশেষ করে বিভিন্ন রক্তবাহী শিরা উপশিরার মধ্যে চর্বির আস্তরণ জমে যায়। ফলে ধমনিতে রক্ত চলাচলের রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যায়, আসলে ডায়াবেটিস হলে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষের কার্যক্ষমতা কমে গেলে বা ইনসুলিন নিঃসরণ বজায় থাকলেও ঠিক মত কাজ করতে না পারলে রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়তে শুরু করে।
মুশকিল হল ডায়াবেটিসের এমন কোনও নির্দিষ্ট উপসর্গ নেই যে লক্ষণ দেখলেই রোগী ডাক্তার দেখাবে। তাই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়েই চলে আর একে একে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে হার্ট, চোখ, নার্ভ, সহ নানা অঙ্গ।

ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া দরকার। কিন্তু পায়ের যত্নের ব্যাপারে বেশিরভাগ মানুষই খুব একটা সচেতন নন। শীতের সময় পা ফাটলে বড়জোর ভেসলিন বা ক্রিম লাগান। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাদের পায়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া দরকার। বিশেষ করে এদের পায়ে ছোট কোনও কাটা বা ক্ষত থেকেও পরে বড় সমস্যা শুরু হতে পারে

ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের নখ বড় হতে দেবেন না। কেটে ছোট করে রাখতে হবে, প্রতিদিন বাড়ি ফিরে অল্প গরম পানি পা ডুবিয়ে রেখে মৃদু সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে নারিকেল তেল বা ক্রিম লাগিয়ে নরম করে রাখতে হবে। অনেক সময় পায়ের ক্ষত অবহেলা করলে বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অ্যাম্পুটেশন পর্যন্ত করতে হতে পারে। ডায়াবেটিসের রোগীদের নিয়মিত পায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার।

ডায়াবেটিসের রোগীদের মধ্যে শতকরা প্রায় ১০ জনেরও বেশি মানুষের পায়ের সমস্যার ঝুঁকি থাকে। এদের পায়ে আলসার হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

সারা বিশ্বে প্রতি বছর ডায়াবেটিসের রোগীদের ১০ – ১৫ শতাংশের পায়ে আলসার হয়। এদের মধ্যে অনেকেরই পা অ্যাম্পুট করা ছাড়া উপায় থাকে না। এই কারণেই পায়ের বিশেষ যত্নের দরকার বলে মনে করেন দুই চিকিৎসকই। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে নার্ভ কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে নিউরোপ্যাথি।

৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে পায়ের আলসারের পেছনে আছে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি। হাইপারগ্লাইসিমিয়া অর্থাৎ রক্তের বাড়তি শর্করা এবং মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কারণে নার্ভ কোষের প্রোটিন ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান গ্লাইকোজেনকে অস্বাভাবিক ভাবে ভেঙে দেয়। এর ফলে নার্ভকোষের প্রোটিন কাইনেজ-সি স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারে না।

নার্ভ কোষ এলোমেলো ভাবে কাজ করতে করতে ক্রমশ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। স্নায়ু তন্ত্রের মোটর, সেনসরি ও অটোনমিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে সংবেদনশীলতা ও স্পর্শ কমতে কমতে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকে। এখানেই শেষ নয়। ক্রনিক ডায়াবেটিসের রোগীদের পায়ের স্নায়ুর কাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পায়ের পেশি, হাড়, ত্বক একে একে সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

পেশি দুর্বল হয়ে পড়ায় পায়ের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। পায়ের ত্বকের ঘর্ম গ্রন্থি ও স্বাভাবিক তেল নিঃসরণ গ্রন্থিগুলোও অকেজো হয়ে পড়ে। ক্রমশ পায়ের ত্বক শুষ্ক খসখসে হয়ে যায়। শুষ্ক ত্বকে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। এদিকে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চোট আঘাত বা ব্যথার বোধ থাকে না। ফলে কেটে ছড়ে গেলে বা সংক্রমণ হলে রোগী টেরই পান না। যখন বুঝতে পারেন তখন দেরি হয়ে গিয়েছে।

ডায়াবেটিসের সঙ্গে রক্তে কোলেস্টেরলএর পরিমাণ বেশি থাকলে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ এবং ধূমপান করলেও রক্তবাহী ধমনির মধ্যে চর্বি জমার প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই পায়ের বিশেষ যত্ন না নিলে পায়ের সমস্যায় গৃহবন্দী হয়ে থাকার ঝুঁকি থাকে। ডায়াবেটিসের রোগীদের পায়ে একবার আলসার হলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

কিছু সাবধানতা মেনে শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে গেলে যথাযথ চিকিৎসা করে ৪০ শতাংশের বেশি অ্যাম্পুটেশন প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়াবেটিসের চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত পায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ও যত্ন নিলে অনেক দুর্ভোগের হাত এড়ানো যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের জুতার ব্যাপারেও কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত।

শক্ত সোলের জুতা পরলে পায়ের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। তাই নরম সোলের হালকা জুতা পরা উচিত। জুতো কেনার সময় হিসেবে বিকেলের দিক বেছে নিতে পারেন। সারা দিনের কাজের পর পা কিছুটা ফুলে যেতে পারে। সকালে জুতা কিনলে বিকেলে পায়ে শক্ত হয়ে চেপে বসলে সমস্যা হতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে ভাল থাকুন।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়, বিশেষ করে বাড়ি ফিরে জুতা খোলার পর নখ থেকে গোড়ালি, পায়ের পাতা, আঙুলের ফাঁক পর্যন্ত লক্ষ করুন। পায়ের শুষ্কতা, লালচে ভাব, আঁচড়, কাটাছেঁড়া, ফোসকা, ফোলা, তাপমাত্রা, ব্যথা ইত্যাদি আছে কি না দেখুন। প্রয়োজনে আয়না বা অন্যের সাহায্য নিন।

১০ মিনিট কুসুম গরম পানি এবং সাবান (সম্ভব হলে তরল সাবান) দিয়ে পা ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে না ঘষে আলতো করে মুছে শুষ্ক করে নিন। বিশেষ করে আঙুলের ফাঁক শুষ্ক রাখা খুব জরুরি। এরপর আর্দ্রতা রক্ষাকারী লোশন ব্যবহার করুন।

গোসলের পর নখ নরম থাকাবস্থায় কোনা না কেটে সোজা ধার রেখে ক্লিপার দিয়ে নখ কাটুন।

গরম পানি, হিটিং প্যাড, সানবার্ন, খালি পায়ে হাঁটা, আঘাত বা ক্ষতাবস্থায় হাঁটা বা ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন। ভেতরটা পরীক্ষা করে জুতা পরুন।

নিরাপদ পায়ের জন্য প্রয়োজন ডায়াবেটিক রোগীদের সঠিকভাবে নির্বাচিত জুতা ও মোজা। খালি পায়ে হাঁটবেন না।

উঁচু হিল, চাপা বা সূক্ষ্ম অগ্রভাগযুক্ত, গোড়ালি বা আঙুল উন্মুক্ত জুতা বা পাদুকা ব্যবহার করবেন না।

শক্ত সোলযুক্ত, নরম প্রসারণক্ষম চামড়া দিয়ে তৈরি ফিতাযুক্ত জুতা ব্যবহার করুন।

জুতা শুষ্ক রাখুন এবং পরার আগে পরীক্ষা করে নিন ভেতরে ক্ষতিকারক কিছু আছে কি না।

ধূমপান, পা ভাঁজ বা ক্রস করে বসা এড়িয়ে চলুন। এতে পায়ের রক্ত চলাচল ঠিক থাকবে।

সঠিক মাপের জন্য নতুন জুতা দিনের শেষে বা রাতে কিনুন। জুতার মাপ আঙুলের দিকে ১-২ ইঞ্চি বড় থাকবে। প্রথম দিন নতুন জুতা ১-২ ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করবেন না এবং ধীরে ধীরে ব্যবহারের সময় বাড়ান। যাদের পায়ের আকৃতিগত সমস্যা আছে, তাদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি জুতা ব্যবহার করতে হবে।

আঁটসাঁট, হাঁটু পর্যন্ত মোজা না পরে কটন, উল বা কটন-উল মিশ্রিত নরম মোজা পরুন।

সুত্রঃ ঢাকাটাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *