সন্তানের প্রথম শিক্ষক মা-বাবা

পরিবার হল অন্যতম সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শিক্ষক হচ্ছেন মা-বাবা। এজন্য বলা হয়ে থাকে- একজন সন্তানের জন্য পারিবারিক শিক্ষাটি খুব বেশি জরুরি এবং সেটি অবশ্যই আদর্শ শিক্ষা। আর এর সঙ্গে যোগ হবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ডিগ্রি। কবি আসাদ চৌধুরী তেমনটিই মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন।

গুণীজনরা বলেন, পরিবারই হচ্ছে শিশুর প্রথম বিদ্যাপীঠ। মা-বাবার কাছেই শিশুর শিক্ষা-দীক্ষা শুরু। মূলত শিশুরা বাবা-মা’র কাছেই লেখাপড়া, নৈতিকতা, আদর্শ বা দেশপ্রেম সম্পর্কে জানতে শুরু করে। তাই মা-বাবাই হচ্ছেন শিশুর প্রথম আদর্শ শিক্ষক। কিংবা মা-বাবাকেই শিশুরা তাদের প্রথম আদর্শ গুরু হিসেবে মানতে শুরু করে। আর সে কারণে শিশুর বেড়ে ওঠায় মা-বাবার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রয়োজন।

শিশুর বেড়ে ওঠায় মা-বাবার ভূমিকা সম্পর্কে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছেন, আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা হলেন- আমার মা। মায়ের কাছে আমি চিরঋণী। আমার জীবনের সব অর্জন তারই কাছ থেকে পাওয়া। নৈতিকতা, বুদ্ধিমত্তা বা শারীরিক শিক্ষার ফল- সবই পেয়েছি তার কাছ থেকে। অন্যদিকে ফ্রান্সের সম্রাট বা ইতালির সাবেক রাজা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন-

তুমি আমাকে আদর্শ মা দাও, আমি তোমাকে আদর্শ জাতি উপহার দিব। আবার অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে- মায়ের শিক্ষাই শিশুর ভবিষ্যতের বুনিয়াদ, মা-ই হচ্ছেন শিশুর সর্বোৎকৃষ্ট বিদ্যাপীঠ।

সন্তানের শিক্ষক বা আদর্শ হিসেবে বাবা-মা সম্পর্কে এমন অসংখ্য বার্তা দিয়ে গেছেন গুণীজনরা। মূলত বাবা-মা’ই হচ্ছেন সন্তানের উত্তম আদর্শ। মা-বাবা শিশুকে যে শিক্ষা দিবেন, শিশু সে শিক্ষা নিয়েই বড় হবে বা সমাজে চলতে শিখবে।

প্রভাষক ও সমাজকর্মী মতিন সৈকত বলেন, সামাজিক লোকাচার শিশুর বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। যে শিক্ষাটি শিশু তার পরিবারের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। লোকাচার বলতে বুঝাতে চেয়েছি- নৈতিকতা, বয়স্কদের সম্মান, ছোটদের স্নেহ ও আত্মীয়দের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ইত্যাদি। আগে দেখা গেছে, গ্রামের বা সমাজের একজন সন্তানকে গ্রামের বা সমাজের সবাই তাদের নিজেদের সন্তান মনে করতেন। আর সন্তানও গ্রামের বা সমাজের সবাইকে নিজের পরিবার, আত্মীয় বা ঘানিষ্ঠজন মনে করতেন। এর অন্যতম কারণ হল, আগে সামাজিক লোকাচারটি অনেক বেশি প্রচলিত ছিল। আবার আজকাল দেখা যায়, সমাজে অনেক ব্যবহার-প্রতিবন্ধী মানুষ আছেন। তারা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও অন্যের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না বা করতে দেখা যায় না। এর অন্যতম কারণ হল, তিনি ছোটবেলায় তার পরিবার বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সামাজিক লোকাচারের শিক্ষাটি ভালোভাবে পাননি বা তাকে দেয়া হয়নি। সেজন্য বড় হয়েও তিনি সামাজিকতায় অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকেন। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, নানা কারণে বর্তমান সমাজে পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি দেখা যায়। ফলে সন্তানরা যেমন আদর্শের বাইরে চলে যাচ্ছে, তেমনি তাদের আদর্শবিমুখতার কারণে সামাজিক নানা সমস্যার সম্মুখীনও হচ্ছি আমরা। আবার সমাজে অনেকেরই নানাভাবে নৈতিক অবক্ষয় ঘটতে দেখা যায়। এটিও পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি হিসেবে ধরা হয়।

বেসরকারি চাকরিজীবী ইউসুফ আহমেদ বলেন, পারিবারিক শিক্ষাটি সন্তানের জন্য খুবই জরুরি। বিশেষ করে নৈতিকতা বা সামাজিক শিক্ষা। সন্তান যদি ছোটবেলায় পরিবার বা মা-বাবার কাছে নৈতিকতা বা সামাজিক শিক্ষা না পায় তাহলে তার একাডেমিক পড়াশোনা করার পরও এক ধরনের শিক্ষার ঘাটতি থেকে যায়- যেটি সামাজিকতা।

গৃহবধূ সুমাইয়া আকতার বলেন, পরিবারই শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষার পরই সে ভর্তি হয় প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রে। আর প্রাথমিক শিক্ষা হিসেবে তার জন্য বেশি প্রয়োজন- আদর্শ বা নৈতিকতা, ন্যায়-অন্যায়, মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক আচার ইত্যাদি। আর এসব পারিবারিক ঘরোয়া শিক্ষাটিই শিশুর বেড়ে ওঠার অন্যতম সঙ্গী।

সাংস্কৃতিককর্মী সাজেদ বলেন, পারিবারিক শিক্ষাটি কতটি জরুরি- তা এখন বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি। সত্যি কথা, ছোটবেলায় ঘরোয়াভাবে মা-বাবার কাছে যেসব সামাজিক শিক্ষা পেয়েছি, সেসব শিক্ষাই এখন সবচেয়ে বেশি কাজে লাগছে। আসলে মূল কথা হল- আদর্শ, নৈতিকতা বা সামাজিকতা এসব তো পরিবারের কাছ থেকেই শিখতে হবে। যে যত বেশি এসব শিক্ষা পরিবারের কাছ থেকে পাবেন, তিনি তত বেশি এগিয়ে যাবেন বা তিনি তত বেশি আদর্শবান হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবেন।
সুত্রঃ যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *